মার্কিন শুল্কে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি জার্মানির

শ্লথ হয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি ফিরছিল না সরকারি নানা পদক্ষেপেও। এর মধ্যেই বিপত্তিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি।

শ্লথ হয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি ফিরছিল না সরকারি নানা পদক্ষেপেও। এর মধ্যেই বিপত্তিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি। গোটা ইউরোপে এ শুল্কনীতির প্রভাবে মহাদেশটির শীর্ষ অর্থনীতি জার্মানিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষজ্ঞদের। বিশেষ করে গাড়ি শিল্পে বাড়তি শুল্ক জার্মানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে ওষুধ আমদানির ওপর আকাশছোঁয়া শুল্কের হুমকির পর শঙ্কায় রয়েছে ইউরোপীয় দেশ আয়ারল্যান্ডও। খবর ইউরো নিউজ।

এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প গাড়ি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। তখনো ইইউতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কায় থাকা দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয় জার্মানি। ওই সময় ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ব্রুগেল জানিয়েছিল, গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর বাড়তি শুল্কের চাপে দীর্ঘমেয়াদে জার্মানির জিডিপির দশমিক ৪ শতাংশ কমতে পারে।

মুডিস রেটিংসের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু হান্টার বলেন, ‘মার্কিন শুল্কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ইউরোপীয় দেশ জার্মানি। আমরা ধারণা করছি, চলতি বছরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জার্মানির ইন্ডাস্ট্রিয়াল সরবরাহ চেইনের সঙ্গে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ছোট দেশগুলো গভীরভাবে জড়িত। যেমন অস্ট্রিয়া। জার্মানির প্রবৃদ্ধি কমে গেলে এ দেশগুলোও একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

ব্রুগেলের গবেষক নিকলাস ফ্রেডেরিক পইতিয়র্সের মতে, শুল্কের সব প্রভাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে এবং প্রাথমিক স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়া কেটে গেলে জার্মানির জিডিপিতে শুল্কের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব হবে প্রায় দশমিক ৪ শতাংশ। ফ্রান্সের ক্ষেত্রে গড় প্রভাব হবে জিডিপির আনুমানিক দশমিক ২৫ শতাংশ।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই সম্ভাব্য শুল্কযুদ্ধের আশঙ্কায় একাধিক প্রস্তাব তৈরি করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ব্রাসেলস।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ররি ফেনেসি বলেন, ‘শুল্কের কারণে আগামী পাঁচ বছরে ইইউর মোট বাণিজ্য ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে।’

গত সপ্তাহে ওষুধ আমদানির পর ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র যদি সে পথে হাঁটে তবে আয়ারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামসহ কিছু দেশও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

ওষুধ খাতে শুল্কের বিষয়টি অনিশ্চিত থাকায় এখন পর্যন্ত ইইউর ওপর সবচেয়ে বড় চাপ গাড়ি খাতে শুল্ক। এ বিষয়ে বিসিএ রিসার্চের প্রধান কৌশলবিদ ম্যাথিউ সাভারি বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো গাড়ি শিল্প। কারণ এতে বড় কোনো ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত এখনো নেই।’

ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পণ্য রফতানিকারক দেশ জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস। এর মধ্যে জার্মান অর্থনীতি ব্যাপকভাবে রফতানিনির্ভর, বিশেষত গাড়ি শিল্পে। জার্মানির মোট রফতানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২২ দশমিক ৭ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

শুল্কজনিত অনিশ্চয়তা ইইউর ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি ফ্রান্স ও স্পেনের মতো দেশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি খুব সীমিত সেসব দেশের প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অ্যান্ড্রু হান্টারের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে দুর্বলতা ও অনিশ্চয়তার আঁচ এসব দেশের ওপরও পড়বে।

প্রসঙ্গত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বেশ কিছু দেশের প্রধান রফতানি পণ্যের ইউরোপমুখী চালানের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো জার্মানি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব দেশের রফতানিতেও পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় আয়ারল্যান্ডও ইউরোপের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উঠে আসছে। কারণ দেশটির মোট পণ্য রফতানির ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রমুখী। তবে সবকিছু নির্ভর করছে ওষুধ খাতে শুল্ক আরোপ হবে কিনা তার ওপর। ম্যাথিউ সাভারি জানান, ওষুধ খাতের হিসেবে আয়ারল্যান্ড হবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ইইউ অর্থনীতি। আয়ারল্যান্ডের জিডিপির ১৮ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিনির্ভর এবং যার ৫৫ শতাংশই ওষুধ খাত থেকে আসে। ফলে প্রবৃদ্ধি ৪-৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ব্রুগেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডের প্রকৃত জিডিপিতে সম্মিলিত ক্ষতি হতে পারে ৩ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানটি আরো বলেছে, কর্মসংস্থান ক্ষতির দিক থেকেও আয়ারল্যান্ড সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশ। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ইতালি। দেশটিতে পরিবহন উপকরণ ও ফ্যাশন এবং গাড়ি উৎপাদন খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান রয়েছে। ওষুধ খাতেও ইতালির উচ্চমাত্রার অংশগ্রহণ রয়েছে।

বিসিএর ম্যাথিউ সাভারি মনে করেন, ওষুধ খাতে ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ সম্ভব নয়। কারণ এতে মার্কিন ভোক্তা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে, যা ভোটারদের কাছে একটি বড় ইস্যু। বরং বিদেশী ওষুধ কোম্পানিগুলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ায় ও দাম কমায়, সে চাপের জন্য কৌশল হিসেবে শুল্কের ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মোটের ওপর ইউরোপীয় অর্থনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কের প্রভাব নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কী হারে শুল্ক আরোপ করে এবং ইইউ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় তার ওপর। তবে ক্ষতির পরিমাণ অঞ্চলটির সব দেশে সমান হবে না বলে নিশ্চিত বিশ্লেষকরা।

সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্রুগেল এপ্রিলে পূর্বাভাস দেয়, মার্কিন শুল্কনীতির কারণে ইইউর জিডিপি চলতি বছর প্রায় দশমিক ৩ শতাংশ কমতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান কমিশনের বসন্তকালীন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউর প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ১ দশমিক ১ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ছিল ইইউ পণ্যের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক গন্তব্য। যার পরিমাণ পুরো ইইউবহির্ভূত রফতানির ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। এ রফতানির মধ্যে ওষুধ খাতের হিস্যা ছিল ১৫ শতাংশ। এর পরই ছিল গাড়ি শিল্প।

আরও